মিশরের তেঁতো শাক- আমাদের সোনালী আঁশ

এস কে বাশার : সোনালী আঁশ বললে আমরা বুঝে নেই পাটের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু পাটের জন্মস্থান বাংলাদেশ নয়। আজ থেকে প্রায় ১৯০০ বছর আগে নীল নদের দেশ মিশরের কোন এক অঞ্চল থেকে এর আগমন ঘটেছিল গঙ্গার পলিযুক্ত উর্বর ভূমিতে। এর যখন আগমন ঘটে তখন এসেছিল তেঁতো স্বাদ যুক্ত ঔষধি গুণ সম্পন্ন শাক হিসেবে। কিন্তু গঙ্গার উর্বর পললযুক্ত সমভূমিতে পড়ে এটি হয়ে গেল পাট। যা পরবর্তিতে সোনালী আঁশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশের সোনালী আঁশের গৌরবজ্জল দিন গুলোর কথা স্মরণ করে আমরা আজো হা-হুতাশ করি। কিন্তু খুব বেশি দিনের কথা নয়। ১৯৮০ সাল পর্যমত্ম পাটের গৌরব বিশ্বময় অটুট ছিল বলেই ধরা হয়। ১৮০০ সালের দিকে পাট যখন বানিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহার শুরু হয় তখন থেকেই এর নাম করণ করা হয় সোনালী আঁশ। ঐতিহাসিকদের মতে ১০০ সালের প্রথম দিকে মিশর থেকে এক ধরণের তেঁতো স্বাদযুক্ত শাকের বীজ আনা হয়। গাছের আকার আকুতি খর্বকায়। বিভিন্ন প্রজাতির শাকের পুষ্টিগুণ ও ঔশধি তথ্য থেকে জানাযায়, পাট শাক কোষ্ঠকাঠিণ্য দুর করে, শরীরে ক্যালসিয়াম বৃদ্ধি করে এবং এটি বল বর্ধকও বটে। কিন্তু ওই শাকের বীজ এদেশের পলরযুক্ত উর্বর মাটিতে পড়ে খর্বকায় থেকে হয়ে গেল দীর্ঘকায়। একপর্যায়ে দেখা গেল শাকের গাছ থেকে শক্ত আঁশ বের হচ্ছে। যা পরবর্তিতে ঘর গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহার হতে লাগল। আবার এর শক্ত কাঠি জ্বালানী হিসেবেও ব্যবহার প্রচলন শুরু হয় প্রথম দিকেই। এক পর্যায়ে শাকের ওই গাছ পানিতে পচানোরও প্রচলন শুরু হয়। যা পরবর্তিতে নামকরণ হয় পাট। ১০০ সালের দিকে পাটের আগমন ঘটলেও এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় ১৭০০ সালের দিকে। ১৮০০ সালের গোড়ার দিকে স্কটল্যান্ডের ডান্ডি শহরে প্রথম পাটকল প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই তেঁতো স্বাদযুক্ত শাকের গাছটি হয়ে উঠল শিল্প পণ্য। এরপর এদেশে উৎপাদিত পাটের আঁশ দীর্ঘ কয়েক বছর ইংল্যান্ডে নানা পরীক্ষা নীরিক্ষার পর ১৮৩২ সালে দিকে পাটের আঁশ বানিজ্যিক উৎপাদনে উপযোগী বলে স্বিকৃতি লাভ করে। ওই সময়ে উৎপাদিত পাট রপ্তানী করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা জমা হতে থাকে দেশীয় কোষাগারে। আর তখনই আদর করে এর নাম রাখা হয় সোনালী আঁশ। অবশ্য নামকরণের সাথে আঁশের যথেষ্ট মিল রয়েছে। গঙ্গা অববাহিকার সকল দেশেই পাট চাষ হয়। তবে উন্নত পাট কেবল বাংলা ভু-খন্ডেই উৎপাদিত হয়ে থাকে। প্রকৃত অর্থে উন্নত পাট উৎপাদনে উন্নত বীজ বা বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির স্পর্শ ছিলনা। কেবল মাটির উর্বরতা গুণেই এ অঞ্চলে মান সম্পন্ন পাট উৎপাদিত হতে থাকে। কৃষক পাট চাষ করত আবার বীজও সংরক্ষণ করত। কিন্তু দেখা যেত, যে জমিতে পাট চাষ করা হতো পরবর্তি বছরে ওই জমিতে পাট চাষ করতে জমির এক তৃতিয়াংশ বীজ হিসেবে রাখতে হতো। এর ফলে পাটের ২০ ভাগ ফলন বিঘ্নিত হতো। ভারত পাকিস্থান ভাগের পর সরকারী ভাবে পাটের বীজ উৎপাদনের লক্ষে কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৬৮-৬৯ অর্থবছরে পাকিসত্মান সেন্ট্রাল ফর জুট কমিটির মাধ্যমে বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করে। ১৯৬৯-৭০ অর্থবছরের দিকে এশিয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় পাট বীজ প্রকল্প ত্বরান্বিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনের পরে পাকিস্থান সেন্ট্রাল ফর জুট কমিটি বাংলাদেশ পাট গবেষনা ইনষ্টিটিউটে রূপামত্মরীত হয়। ১৯৮৮ সালে পাট বীজ প্রকল্প বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে হসত্মামত্মরিত হয়। ২০০৪-০৫ অর্থ বছরে পাট বীজ প্রকল্পটি ‘‘পাট বীজ কর্মসূচী’’ হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়ে গৃহিত হয়। ২০০৫-০৬ অর্থ বছরে এ কর্মসুচি কার্যকর করা হয়। বর্তমানে দেশে ৬টি জোনে অর্থাৎ ঢাকা, টাঙ্গাইল, বগুড়া, রাজশাহী, কুষ্টিয়া এবং যশোর অঞ্চলে বিএডিসির মাধ্যমে পাট বীজ উৎপাদিত হচ্ছে যা দেশের সামগ্রিক বীজ চাহিদা পুরণ করতে সক্ষম। ১৮০০ সাল থেকে শুরু করে প্রায় দেড়শ বছর পাট তার স্বর্ণাসন ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ১৯৮০ সালের দিকে পাট শিল্পকে নিয়ে সরকারের নানামুখি অব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক বাজারের সাথে দুরত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে সোনালী আঁশ তার অবস্থান হারায়। সম্প্রতি পাটের জন্ম রহস্য উদঘাটন করেছেন গবেষকরা। পাটের বিশ্ববাজারও এখন উজানমুখী। কৃষকও আবার পাট চাষমুখী হচ্ছে। এ অবস্থার যাতে পরিবর্তন না ঘটে সেদিকে সরকারকেই যত্নশীল হতে হবে। (তথ্যসুত্রঃ দ্বি-মাসিক কৃষি সমাচার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি তথ্য সার্ভিস)।