নিবিড় ধান চাষ মাটির খাদ্য ঘাটতি সৃষ্টি করছে

এস কে বাশার \ একই জমিতে সারা বছর অর্থাৎ তিন মৌসুমে ধান চাষ করাকে নিবিড় ধান চাষ বলে। একই জমিতে সারা বছর ধান চাষের ফলে জমিতে কোন একটি বিশেষ খাদ্যের অভাব দেখা দেয়। মাটিতে খাদ্যের অভাব জনিত কারনে নানা রকম রোগ-বালাই’র আক্রমন হতে পারে। আর এ অর্থেই বলা হয় নিবিড় ধান চাষ ফসলের রোগ বালাই বৃদ্ধি করে। বন্যামুক্ত বা স্বাভাবিক সেচের ব্যবস্থা আছে এমন জমি ধান চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। এ ধরনের জমিকে চাষীরা সাধারনত ধান চাষের জন্য বেছে নেয়। ওই জমিটি ধান চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী তবে সারা বছর ধান চাষের জন্য উপযোগী নয়। এক খন্ড জমিতে যদি সারা বছর ধান চাষ হয় আর ওই জমিতে যদি সুষম সার ব্যবহার না হয় তাহলেই দেখা দিতে পারে বিপর্যয়। অর্থাৎ ফসল নানা রোগ ও কীট পতঙ্গ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। একটি জমি থেকে অধিক ধান প্রাপ্তি বা খাদ্য চাহিদা পুরণের আশায় চাষীরা সারা বছর ধান চাষ করে থাকে। একদিকে সারা বছর ধান চাষ অপর দিকে জমিতে সুষম সার ব্যবহার না হওয়ায় দেখা দেয় নানা রোগ-বালাই। রোগ বালাই’র আক্রমনে চাষীর কাঙ্খিত ফলের পরিবর্তে ফসল হানির কারণ হয়ে দেখা দেয়। দেশে বর্তমান ফলন অনুযায়ী এক বছরে এক বিঘে জমি থেকে সর্বাধিক ৫০ মন ধান উৎপাদন হচ্ছে। যা মোটেও ভাল ফলন নয়। অথচ ওই জমি থেকে এক বছরে দুই মৌসুমে ৫০-৬০ মন ধান উৎপাদন হবার কথা। দেশের অন্যতম ফসল জোন কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকার চাষীরা ধানী জমিতে কেবল ধান চাষ করে থাকে অর্থাৎ আউশ, আমন এবং বোরো তিন মৌসুমেই ধান চাষ করে। বর্তমান চাষীরা যে সব ধান চাষ করে এক মৌসুমে তার ফলন হবার কথা সর্বনিম্ন ২৫-৩০ মন। কিন্তু ওই জমিতে সারা বছর ধান চাষ হওয়ায় এবং সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার না হওয়ায় বোরো মৌসুমে বিঘে প্রতি ২০ মন, আউশ মৌসুমে ১২ মন এবং আমন মৌসুমে ফলন পাচ্ছে ১৫ মন। অর্থাৎ বাৎস্যরিক ফলন কখনই ৫০ মন পার করতে পারছে না। কিন্তু চাষীরা যদি ফসলের বিন্যাস মেনে চাষ করত অর্থাৎ দুটি ধানের মাঝখানে এক মৌসুমে সবজি, ডাল, তৈলবীজ বা পাট চাষ করত তাহলে ফলন আরো বৃদ্ধি পেত। আবার উফসি জাতের ধানের স্বাভাবিক ফলন ২৫-৩০ মন হওয়া সত্বেও ২০ মন ফলন পেতেই চাষীকে গলদঘর্ম হতে হয়। কিন্তু স্বাভাবিক সেচনীতি, সুষম সার ব্যবহারনীতি, জৈব সার ব্যবহার এবং উন্নত বীজ সংরক্ষন পদ্ধতি মেনে চাষাবাদ করা হলে অল্প খরচে কাঙ্খিত ফলন পাওয়া সম্ভব। ধানী জমিতে সেচের অর্থ এই নয় যে সারা বছর ধান ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে রাখা বরং জমিতে স্বাভাবিক রস থাকাই সেচনীতি অর্থাৎ আবার জমি একবার ভিজবে আবার শুকাবে এটাই সেচনীতি। চাষীরা জমিতে ধান রোপনের আগে সার ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। বরং ধান রোপনের পরেই সার ব্যবহার করে থাকে চাষীরা। আর সার বলতে চাষীরা কেবল ইউরিয়াকেই বুঝে থাকে। টিএসপি এবং এমওপি সার ব্যবহার হয় যৎসামান্য, জিপ, জিংক, দস্তা, বোরন সার ব্যবহার হয়না বললেই চলে। অথচ মাটি থেকে ভাল ফসল উৎপাদনের জন্য ১৬টি উপাদান প্রয়োজন। এসব উপাদানের কিছু মাটি বাতাস ও পানি থেকে সরবরাহ করে আর বাকি কিছু উপাদান চাষীকে সরসরি প্রয়োগ করতে হয়। জমিতে সরাসরি প্রয়োগকৃত উপাদানের মধ্যে অন্যতম জৈব সার যা কখনই ব্যবহার হয়না। জমিতে সব ধরনের সার সমানভাবে ব্যবহার না হওয়ায় দেখা দেয় রোগ এবং কীট-পতঙ্গের আক্রমন ঘটে। আক্রান্ত ক্ষেতের পোকা ও রোগ দমন করতে যেয়ে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় আবার আক্রান্ত ক্ষেত থেকে স্বাভাবিক ফলন প্রাপ্তি বিঘ্নিত হয়। একটি জমি থেকে ভাল ফসল পাবার জন্য চাষীকে অবশ্যই ফসল চাষনীতি মেনে চলা উচিত। ফসল চাষনীতি কেবল ভাল ফসলই দেয় না একই সাথে চাষ ব্যয় কমায় এবং রোগমুক্ত ভাল ফসল প্রাপ্তি নিশ্চিত করে।